বাংলাদেশ কথা কয় : সম্পাদকের কথা
যুদ্ধ-সাহিত্যের সমাদর সব দেশেই রয়েছে। তার তাৎক্ষণিক প্রচার ও জনপ্রিয়তা ব্যাপক। যে-কারণে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের উপরে লেখা এককালের জনপ্রিয় ইংরেজি বা রুশ উপন্যাসও আজ আর তেমন সমাদৃত নয়, ঠিক একই কারণে যুদ্ধ ও মন্বন্তর নিয়ে লেখা চল্লিশের বাংলা গল্প ও উপন্যাসও পাঠক-মনে আর তেমন রেখাপাত করে না।
যুদ্ধ ও বিপ্লব সব সময় সমার্থবোধক নয়। এজন্যেই গণ-বিপ্লব, রাষ্ট্রবিপ্লব ও গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি নিয়ে রচিত কোন কোন যুদ্ধ-সাহিত্য যুগোত্তীর্ণ সাহিত্য। যে কাহিনীতে কেবল যুদ্ধই মুখ্য নয়, যুদ্ধের পেছনের সামাজিক ও রাজনৈতিক দিগন্ত বিস্তৃত, তা রসোত্তীর্ণ হলে যুগজয়ী সাহিত্যের ধ্রুপদী-চরিত্র লাভ করে—যেমন টলস্টয়ের ‘ওয়ার এণ্ড পীস্’, এরেনবুর্গের ‘ফল্ অব পারি’। বাংলাদেশের বর্তমান মুক্তিযুদ্ধও কেবল যুদ্ধ নয়, বরং গণ-বিপ্লবের চরিত্রযুক্ত যুদ্ধ। বাংলা সাহিত্যে এর রেখাপাত তাই বলিষ্ঠ ও ব্যাপক হওয়াই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের সমাজ-মানস ও সাহিত্য-মানস কতটা গতিশীল, ক্রিয়াশীল এবং পরস্পরযুক্ত, তার প্রমাণ মিলবে ১৯৫০ সালে প্রথম ঢাকা থেকে ‘দাঙ্গাবিরোধী পাঁচটি গল্পের’ আত্মপ্রকাশে। পরবর্তী কালে ভাষা আন্দোলন থেকে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের সাহিত্য নানাভাবে মোড় ফিরেছে, সমৃদ্ধ হয়েছে, জন-মানসের প্রতিরোধ চেতনাকে বিস্তারলাভে আরো সাহায্য করেছে। বর্তমান জাতীয় মুক্তির যুদ্ধেও বাংলাদেশের গল্প ও কবিতার ভূমিকা তাই গৌণ নয়।
‘বাংলাদেশ কথা কয়’ গ্রন্থে সন্নিবেশিত বাংলাদেশের কয়েকজন তরুণ ও প্রবীণ কথাশিল্পীর লেখা গল্পগুলো তাই নিছক যুদ্ধ-সাহিত্য নয়; বরং বাঙালী জাতির মানসের বর্তমান বিপ্লবী প্রতিরোধ চেতনার কয়েকটি রূপরেখা। এত কাছের ঘটনা ও চরিত্র নিয়ে লেখা গল্প সকল সময় গল্প হয়ে ওঠে না। কখনো কখনো প্রামাণ্য চিত্র হয়ে ওঠে। সুতরাং কোন পাঠক যদি এই গল্পগুলোর প্রত্যেকটিতে সার্থক গল্পের রস অথবা কুশলী হাতের সৃষ্ট চরিত্র ও ঘটনা-সন্নিবেশ খোঁজেন, তাহলে নিরাশ হতেও পারেন। বাংলাদেশের সাহিত্য-মানসে বর্তমান জাতীয় বিপ্লবের প্রচণ্ড বাত্যা ও তরঙ্গ থেমে গিয়ে যখন সৃষ্টির পলি জমবে, তখনই কেবল আশা করা যাবে, এই মহাবিপ্লবের কাহিনী নিয়ে লেখা সার্থক, রসোত্তীর্ণ এবং হয়তো বা যুগোত্তীর্ণ গল্প ও উপন্যাসের। বহমান ঘটনার প্রবল বাত্যা যখন থেমে যাবে, তখনই কেবল আমাদের লেখকরা পাবেন নির্লিপ্ত দৃষ্টিশক্তি, নিরাসক্ত চিন্তার ক্ষমতা এবং খুঁজে পাবেন ঘটনা ও চরিত্র—বিশ্লেষণের অনুদঘাটিত সূত্র। তবু এখনও বাংলাদেশের লেখকেরা লিখছেন। তাতে রয়েছে, প্রবল আর্তি, ক্ষোভ, ক্রোধ, আশা-হতাশা ও উদ্দীপনার সাময়িক উত্তাপ এবং যন্ত্রণা।
‘বাংলাদেশ কথা কয়’—এই গল্পগ্রন্থে তাই সব গল্পই গল্প নয়। কোনটি যথার্থ সার্থক গল্প। কোনটি প্রামাণ্য চিত্র, কোনটি সমকালীন ঘটনার প্রচণ্ড উত্তাপ অথবা অন্তর্দাহ। কোথাও আশা উচ্চারিত। কোথাও নিঃশব্দ নৈরাশ্য প্রতিভাসিত। কোথাও যুগপৎ আশা-নিরাশা, আনন্দ ও বেদনা পাশাপাশি সমুচ্চারিত। বাংলাদেশের সমকালীন মন ও চরিত্রের, জাতীয় মুক্তির বিপুলাবেগে প্রসারিত ঘটনাবলীর উচ্চারিত কণ্ঠ তাই—বাংলাদেশ কথা কয়। এই কথার সঙ্গে পরিচয় বর্তমান ঝঞ্ঝাক্ষুদ্ধ বাংলাদেশের সঙ্গেই, হোক তাৎক্ষণিক—কিন্তু প্রকৃত ও প্রত্যক্ষ পরিচয়।
আবদুল গাফফার চৌধুরী
২৫ কার্তিক ১৩৭৮, ডিকসন লেন, কলকাতা
আবদুল গাফফার চৌধুরী
সাহিত্যজগতে অনন্য প্রতিভা। সবসময়ই নিজের লেখা দিয়ে পাঠকের মন ছুঁয়েছেন, ভাবনা জাগিয়েছেন ভিন্নতার। মফস্বলে বেড়ে ওঠা। নিত্য দিনের জীবন থেকেই লেখার অনুপ্রেরণা খুঁজে নিয়েছেন। প্রকাশনার ক্ষেত্রে নতুন হলেও তাঁর হৃদয়গ্রাহী বর্নণার মাধ্যমে জীবন, প্রকৃতির জীবন্ত এক চিত্রই পাঠকের সামনে হাজির করেন।
-
গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থায় রাষ্ট্র সকল মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা; অনিয়ম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ কিংবা সকল ধরনের কর্তৃত্বের বিপরীতে ক্ষোভ প্রকাশের অধিকারকে নিশ্চিত করে। খাওয়া, পরা, থাকাসহ সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সার্বিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের স্বীকৃত দায়িত্ব। রাষ্ট্রীয় এসব দায়িত্ব কিংবা অধিকার প্রশ্নে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ যতবেশি বিস্তৃত ও গভীর হয়, রাষ্ট্র ততই গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালনায় সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান আর্থ-সামাজিক-রাজনীতিক পরিসরে ব্যাপকতর জনগণের প্রতিনিধিত্ব ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। সেখানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অগণতান্ত্রিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সুবিধা ও ক্ষমতাভোগী ভাবনা প্রসারিত হচ্ছে, প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে গোষ্ঠীগত ক্ষমতা আর বিশেষ শ্রেণী-পেশার মানুষের আধিপত্য। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় যে কোনো
-
দুই দশকেরও বেশি আগে বিজ্ঞানচেতনা পরিষদের যাত্রার শুরুতে বিজ্ঞান ও চেতনা শব্দ দুটি আলাদা না কি একসঙ্গে লিখব তা নিয়ে আমাদের মধ্যে তর্ক ছিল। পরে আমরা সিদ্ধান্ত নিই দুটি শব্দ একসঙ্গেই লিখব: বিজ্ঞানচেতনা। আমাদের সমাজে পরীক্ষাগার, গবেষণা ইত্যাদি সম্পর্কিত ভাবনার জায়গা থেকে বিজ্ঞানকে দেখার চল বেশ প্রতিষ্ঠিত, শক্তিশালীও বটে। কিন্তু এসব থেকে প্রকৃতি ও মানুষ বিচ্ছিন্ন থাকলে তা সামগ্রিকতা পায় না। তাই শুরু থেকেই আমরা বিজ্ঞান ও চেতনাকে আলাদা করিনি। বিজ্ঞানকে চেতনা থেকে আলাদা করলে তা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে প্রকৃতির জন্য, মানুষের জন্য। এই সামগ্রিকতার মধ্যে পরস্পরের সম্পর্ক ও অবস্থানকে বিশ্লেষণ ও যাচাই করা, মানুষের মধ্যে প্রশ্ন করার সক্ষমতা তৈরির
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.
Featured News
Advertisement
-
welcome
- by Shamim Ahmed Chowdhury
- ১৫ Jan ২০২৬
-
Thank you
- by bappi
- ১৫ Jan ২০২৬
-
good
- by Shamim Ahmed Chowdhury
- ১৫ Jan ২০২৬
Comments